content
stringlengths
0
129k
আমি অনেকের মধ্যে একা হয়ে সেই দৃশ্য দেখতাম এবং সব সময়ই আমার সংবিৎ ফিরতো অন্য কারো চেষ্টায়
একবার তো জুতো পুড়িয়ে আমার জ্ঞান ফেরানো হয়েছিল
কিন্তু আজ ও কেমন থমকে বুড়বুড়ি কাটছে আর চোখ মেলে দেখছে আমাকে!
এই মাসে এই নিয়ে দু দু'বার ওকে দেখলাম
দু' সপ্তাহ আগে দুপুরে খাবার টেবিলে কেবল ভাত মুখে তুলেছি হঠাৎ উলটো দিকের দেয়ালটা দুলে উঠল আর পলক না ফেলতেই দেয়াল ফুঁড়ে মাছটা মা-বাবার ছবির ওপর লেজ নেড়ে ভেসে বেড়াতে লাগল
তারপরেই সেই দৃশ্য; সবুজ শাড়ি পরা কেউ একজন ঝুলছে উঁচুতে
এত উঁচুতে যে মুখ দেখা যাচ্ছিল না, কেবল পা জোড়া আমার দৃষ্টি সীমায়
হাল্কা সবুজ জমিনে উজ্জ্বল সবুজ সুতোর কাজ করা পাড় গোড়ালির উপর আলগোছে জেগে আছে
তার নিচেই গোলাপি নেইল পলিশ পরা প্রাণহীন পায়ের পাতা দুলছে- একবার এদিক আর একবার ওদিক
হুঁশ ফিরল মা'র চেঁচামেচিতে
বেচারি মা ভাতের থালা থেকে আমার মাথা টেনে তুলতে হিমশিম খাচ্ছিল
মাকে দেখে আমার ভীষণ মায়া হয়েছিল
পরদিনই মা আবার আম্বিয়ার মা'কে খবর দিয়ে তাবিজ আনিয়েছিল
এবারেরটা মোক্ষম!এই হুজুর নাকি একই সময়ে তিন জায়গায় দর্শন দিয়েছেন
আমার মা একজন অদ্ভুত মহিলা
সরকারি কলেজে পদার্থ বিজ্ঞান পড়ায় প্রায় কুড়ি বছর ধরে, কিন্তু মাদুলি-কদলীতে মহা আগ্রহ
বাবার আত্মার সদগতির জন্য দশ বছর ধরে নিষ্ঠার সাথে শনি-মঙ্গলের উপোস করে যাচ্ছে
মা কিংবা আম্বিয়ার মা দু'জনের কেউই আমার এই মৎস্য দর্শনের ব্যাপারটা জানে না
এসব তাবিজ কবজ চলছে আমার ফিটের ব্যামো তাড়াতে
তবে মাছ দেখার ব্যাপারটা যখন প্রথম ঘটেছিল তখন সবাই জেনেছিল
আমার বয়েস সবে ছয় ছুঁই ছুঁই
কুমিল্লা থেকে দাদার পৈতে উপলক্ষে দাদুর বাড়ি চট্টগ্রামের রাউজানে গিয়েছিলাম
ছোট মামাও সে বছর কানাডা থেকে সব ছেড়েছুড়ে বিন্দাস বাড়ি ফিরেছিল- চৌদ্দ বছর পর
মাছ ধরা ছোট মামার নেশা
ঘন্টার পর ঘন্টা জলের ওপর চোখ ভাসিয়ে মামা বসে থাকত
ব্যাপারটা আমার দারুণ পছন্দের ছিল
মামাকে দেখতে তখন বেশ ঋষি ঋষি লাগত
সেইদিন আমি আর দাদা পুকুর ঘাটে মামার মাছ ধরা দেখছিলাম
মামা ছিপ ফেলে বসে আছে, পাশে ফ্লাস্ক ভর্তি চা
আমরা দুই ভাই বোন অধীর আগ্রহ নিয়ে জলের দিকে তাকিয়ে আছি মামার মতই
আমার একটা ড্রইং বই ছিল, আঁকা শেখো
প্রত্যেক পাতার ওপর ভাগে একটা করে রঙিন ছবি তার ঠিক নিচে রঙ ছাড়া সেই একই ছবি
সেই বইয়ে একটা মাছের ছবি ছিল
রুপোলি ঝলমলে লাল চোখের পেট মোটা মাছ - নিচে লেখা ডিম ভরা কৈ
কৈ মাছ মোটেও রুপোলি নয় তাতে কী! ছবিটা আমার ভীষণ প্রিয় ছিল
সেই সস্তা আঁকার বইটা হারিয়ে গেছে কবেই কিন্তু এখনও কৈ মাছের নাম শুনলেই ছবিটা আর সেই নরম রোদের সকালটা ঝাঁ করে সামনে ভেসে ওঠে
আমার ক্রেয়নের বাক্সে কোন রুপোলি রঙ ছিল না তাই ডিম ভরা কৈ মাছটা আর রাঙানো হয়নি
সেইদিন খুব চাইছিলাম অমন একটা রুপোলি ঝলমলে মাছ মামার বড়শিতে গাঁথুক
আমার ধৈর্য যখন এক্কেবারে চুড়ান্ত সীমায় ঠিক তখনই সত্যি সত্যি ফাতনাটা নড়ে উঠল
দাদার হাতে ছিল ছিপ, মামা জলে চোখ রেখেই চা ঢালছিলেন
দাদা ভড়কে গিয়ে জোরে দিল টান আর আমি দেখলাম চোখ ধাঁধানো রুপোলি আলো পুকুরের অন্য পাড়ে
মাছটা ভাসছে জলে নয়, জলের ওপরে
অদ্ভুত সুন্দর আলোর ঝরনার ভেতর ওর রুপোলি শরীর ঝিকমিক করছে
আমার চারপাশ যেন থমকে গেল
কেবল আমি আর মাছ আর কোথাও কিচ্ছু নেই
সে এক অদ্ভুত অনুভূতি
কাচের মত ওর স্বচ্ছ লাল চোখ আমার চোখ ছুঁয়ে যাচ্ছিল
তারপরই দেখলাম সেই ভয়ংকর দৃশ্য
মাছটা লেজ নাড়তেই দেখি নিচে জলের তলায় শংকর দাদা ভাসছে
সাদা ন্যাতানো ভিজে কাগজের মত শংকর দাদা
এরপর আমার আর কিচ্ছু মনে নেই
জ্ঞান যখন ফিরল তখন আমি হাসপাতালের বিছানায়
দাদার আর পৈতে হয়নি সেবার
জ্ঞান ফেরার পর শংকর দাদাকে স্বশরীরে দেখেও আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না ও বেঁচে আছে
শংকর দাদা আমার বড় মামার ছেলে
পরের বছর আমার জন্মদিনে ও আমাকে বইটা দিয়েছিল
বইয়ের ভেতরে লেখা ছুঁটকিকে ভুঁত দাঁদার উঁপহার
সে বই আজও আমার কাছে আছে
একানব্বইয়ের ঘূর্ণিঝড়ে শংকর দাদা মারা যায়
মহেশখালি বেড়াতে গিয়েছিল বন্ধুদের সাথে
আমার তখন আট চলছে
লাশ ভেসে উঠেছিল তিন দিন পরে
মাছেরা বাঁ চোখ ঠুকরে খেয়ে নিয়েছিল
চেনা যায়না, ন্যাতানো কাগজের মত নয়--ফুলে ফেঁপে ঢোল! আমি দেখিনি, শুনেছি
আমরা তখনও কুমিল্লায়
আমার মাছ দেখার সেই ব্যাপারটা আত্মীয় স্বজনের মুখে মুখে ফিরছিল আবার
ভাগ্যিস কুমিল্লায় আমাদের কাছের কেউ ছিল না!
শংকর দাদা মারা যাওয়ার পর আমি ভয়ে জলের ধারে যেতাম না
মনে হত এই বুঝি মাছটা খলবলিয়ে উঠবে
ফিটের ব্যামোটা তখন থেকে
বাবা নিয়ে গিয়েছিল, দাদু দাদু চেহারার সেই সাইকাইয়াট্রিস্টের কাছে, "তুমি ভাবছ দেখছ আসলে কিন্তু দেখছ না
মৃত্যুটাতে মাছের কিছু করার নেই, কাকতালীয়'
ফেরার পথে বাবা 'কাকতালীয়' মানে বোঝাতে রাজ্যের গল্প বলেছিল আর আমি বুঝে গিয়েছিলাম মাছটাকে আমার মগজেই রাখতে হবে বলা যাবে না কাউকে
মাছটাকে ফের দেখেছিলাম আমার ষোল বছরের জন্মদিনের ঠিক আগের দুপুরে
মায়ের কলেজের বনভোজন ছিল সেদিন
ফেরার পথে ভাইস প্রিন্সিপাল ম্যাডামের শ্বশুর বাড়ি গিয়েছিলাম আমরা
বিশাল বাড়ি
অনেক ফলের গাছ
ম্যাডামের বর পেশায় ডাক্তার; প্রচুর মালদার
আমাদের করমচা গাছ দেখাতে নিয়ে গেলেন দিঘির পাড়ে
সবুজ টলটলে জল
চারধার ঘিরে দাঁড়ানো গাছেরা যেন আয়নায় ঝুঁকে নিজেদের দেখছে
হঠাৎ ল্যাজ ঝাপ্টে মাঝ পুকুরে ভেসে উঠেছিল মাছটা
রুপোলি আঁশ চকমক করছে
তারপর একটা মুখ মাছটার ঠিক ওপরে
ভীষণ মিষ্টি
সোনালি চুলের রূপকথার রাজকন্যার মত
লাল শাড়ি পরা
পলক না ফেলতেই মিলিয়ে গেল মাছ, মিলিয়ে গেল রাজকন্যা
সংবিৎ ফিরে পেতেই দেখি আমার উপর পাঁচ ছ'জোড়া উৎসুক চোখ
মাকে ভীষণ ভড়কে দিয়েছিলাম আমি, দাদা তখন নিউইয়র্কে
পরের বছর দাদা অনেক ছবি পাঠিয়েছিল
ওর বন্ধুদের ভিড়ে একটা মুখ দেখে আমার হাত পা শক্ত হয়ে গিয়েছিল
সেই লাল শাড়ি পরা সোনালি চুলের জলের ওপর ভাসা রাজকন্যা! দাদার গা ঘেঁষে দাঁড়ানো--সামান্তা
গত বছর ওরা বিয়ে করেছে
এ বছর গ্রীষ্মে দেশে আসবে
দশ বছর আগে সেই বিকেলে বাবা ছাদে গেয়েছিল, "মেঘ বলেছে যাব যাব"
খুকু মাসি গলা মিলিয়েছিল "রাত বলেছে যাই"
আমিও গেয়েছিলাম কিছু একটা
তারপর এক সময়ে ঘর সাজাতে নেমে গিয়েছিলাম নিচে