content stringlengths 0 129k |
|---|
দেখেছিলাম |
তারপর প্রায় ঘণ্টা দুই কিংবা আড়াই হবে, মিশা আর অভিষেকের গান, সঙ্গে দেদার আড্ডায় ট্রেনযাত্রা শেষ হলে প্ল্যাটফর্ম থেকে বেরিয়ে এসে একটা ভ্যানে চেপে বসি; যেহেতু মোরিগাঙে, আদিবাসীদের বসতির কাছ অবধি ভ্যানচালক যাবেন না বলে জানিয়ে দিয়েছিলেন প্রথমেই, ফলত তাঁকে টাকা-পয়সা মিটিয়ে দিয়ে ভদ্রলোকের দেখিয়ে-দেওয়া রাস্তা ধরে হ... |
যত এগোচ্ছিলাম, চারপাশের গাছের সংখ্যা বাড়ছিল, ঝোপঝাড় ক্রমে ঘন হচ্ছিল |
মিশা গুনগুন করতে-করতে হাঁটছিল; পুরোনো দিনের কোনও-একটা হিন্দি গান |
গাইতে পারি না বলে সেই সুরটাকে শিস্ দিয়ে ধরবার চেষ্টা করছিলাম আমি, মিশার অপাঙ্গে কঠিন দৃষ্টিতে থেমে গিয়েছিলাম তখনকার মতো |
তখন শুধু চার জোড়া পায়ের চাপে শুকনো পাতার মর্মর, পিঠের উপর ছোটো রুকস্যাকের লেস্ দুটোয় উদ্দীপনার নখ ঘষার ক্ষীণ শব্দ, মিশার গুনগুনানি, অভিষেকের প্যান্টের পকেট থেকে কিছুটা-খালি-হয়ে-যাওয়া দেশলাই বাক্সের নড়ানড়ির হালকা শব্দ, মাঝে-মধ্যে পরিচিত কিংবা অপরিচিত কোনও পাখির ডাক |
এইভাবে বেশ খানিকটা চলার পরে অভিষেক কিংবা আমার, যে-কারও হতে পারে, পায়ের চামড়ার চটিটা পরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গতি বিধানে ব্যর্থ হয়ে ছিঁড়ে গিয়েছিল আর আমরা বুঝে ফেলেছিলাম, আমরা আমাদের গন্তব্যে এসে পৌঁছেছি |
এমন সময় ভাঙা-ভাঙা হিন্দি আর বাংলা মিশিয়ে উদ্দীপনাই প্রথম বলে ওঠে : 'লেকিন কেন জানি না আমার মনে হচ্ছে কোই-না-কোই চুপকে সে হমকো ঘুর রহে হ্যায় |
আমরা চারজন ছাড়াও কোই হ্যায় ইহা |
' একটা হেলানো গাছের গুঁড়িতে ঠেস দিয়ে বসে একটা সিগারেট ধরায় অভিষেক |
তারপর পোড়া দেশলাইকাঠিটা আবার ভরে রাখে বাক্সে |
চারপাশে শুকনো পাতার স্তূপ, সামান্য অসাবধানতা থেকে বড়ো কিছু হয়ে যেতে পারে; কিন্তু সিগারেটের ছাই কিংবা শেষ মুহূর্তের জ্বলন্ত ফিল্টার কোথায় ফেলবে - যখন আমি এমনটা ভেবে ওকে জিজ্ঞেস করতে যাব, দেখলাম, ব্যাগের সাইড পকেট থেকে একটা ছোট্ট চারচৌকো কৌটো, কাঠখোদাই এবং বার্নিশ, বের করে আবার সাইড পকেটটার চেন এঁটে দিল ও |
আমরাও ঈষৎ ক্লান্ত; মিশা নিচু দেখে একটা গাছের ডাল বেছে নিয়ে মোটামুটি একটা হেলান দিয়েছে আর আমি ওই শুকনো পাতার উপরেই বসে পড়েছি পা ছড়িয়ে |
সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে অভিষেক বলল : 'ক্ষেপেছিস নাকি! কে ঘুরবে আমাদের! তুইও না উডি - ! ছোড়্ ওসব! সিগারেট পিয়েগি - !' দোনোমনা করে উদ্দীপনা হাত বাড়ায় |
আমি বুঝি, ও এখনও ওই নজর-রাখার-ব্যাপারটাতেই আটকে আছে |
অভিষেক অর্ধেক সিগারেটটা আর কাঠের বাক্সটা ওর হাতে দিয়ে আড়মোড়া ভাঙে; মাংসপেশিগুলোর সংকোচন-প্রসারণের সঙ্গে-সঙ্গে বহুদিন না-ছাঁটা, ঝুলে-নামা ওর রাবীন্দ্রিক দাড়িও যেন অস্পষ্ট দুলে ওঠে; পরক্ষণেই ক্লান্তি ঝেড়ে বলে ওঠে : 'সো কমরেডস্, লেটস্ গো! আলো থাকতে-থাকতে আমাদের পৌঁছে যেতে হবে |
অতএব লেডিজ অ্যান্ড জেন্টলম্যান, গেট আপ!' আমাদের হাঁটা শুরু হয় আবার |
আরও-কিছুটা এগোনোর পর মাথার ভিতর একটা অদ্ভুত শব্দ টের পাই আমি; ওরা কেউ সেই আওয়াজ শুনতে পেয়েছিল কিনা, ওদের চোখ-মুখের হাবভাব দেখে যেহেতু তেমন অস্বাভাবিক কিছু আমার চোখে পড়েনি, আমিও তাই যথাসম্ভব স্বাভাবিক হাঁটতে থাকি; এদিকে মাথার ভিতর কে যেন ক্রমাগত হাতুড়ির বাড়ি মারতে থাকে |
গুম্ গুম্...গুম্ গুম্... |
দ্রিমি দ্রিমি দ্রুম...দ্রিমি দ্রিমি দ্রুম...দ্রিমি দ্রিমি দ্রুম... |
মাথার ভিতর হাতুড়ি-পেটার আওয়াজটা, কিছু পরে, আমার মনে হতে থাকে, কারা যেন নাগাড়ে ঢাক বাজিয়ে চলেছে |
তার শব্দ হচ্ছে : দ্রিমি দ্রিমি দ্রুম... |
আওয়াজটা যে অনেকগুলো ঢাকের একসঙ্গে একতালে বেজে-চলার শব্দ, তা সম্পর্কে আমি যখন প্রায় নিঃসন্দেহ হয়ে উঠতে যাচ্ছিলাম, তখনই উদ্দীপনা আর মিশার মাঝখান দিয়ে - কারণ যেহেতু অভিষেক হাঁটছিল একেবারে সামনে, তাই সে স্বভাবতই দেখেনি তার পিছনে কে বা কী দাপাদাপি করে গেল হঠাৎ - যতদূর মনে হল ওদের দু'জনের, একটা বুনো শুয়োর ছুটে গেল এদিক... |
চকিতে মনে হয়েছিল, ওই তীব্র গতিতে ছুটে-যাওয়া লোকটাকে আমি আগে দেখেছি ডেঙ্কালির গভীর জঙ্গলে; ওর নাম গুরান |
ভূমিকম্পের পর কিছুটা সময় জুড়ে মাটি কাঁপতে থাকে, তা স্তিমিত হয়ে এলে চারপাশ শান্ত হয়ে যায়; বুনো শুয়োর কিংবা গুরান, দুইয়ের মধ্যে যে-কেউই হতে পারে, আবার না-ও হতে পারে, ওভাবে ছুটে-যাওয়ার পরবর্তী কিছুক্ষণ জুড়ে ছিল উদ্দীপনা আর মিশার হার্টবিটের দ্রুত চলন, অভিষেকের জ্ঞান কপচানোর ভরা সুযোগ আর তারপর একটা সময় আবার হাঁটতে... |
এই আবারও হাঁটা শুরু হলে আমি বলেছিলাম : 'জায়গাটা কেমন যেন কমিকসে-পড়া অরণ্যদেবের আস্তানার মতো লাগছে |
কাছাকাছি কোথাও খুলিগুহা নজরে পড়লেও আশ্চর্য হব না |
' 'খুলিগুহা না-পেলেও গাছবাড়ি পেতেই পারিস |
মানে ওই আদলের অনেকটা |
আর যদি এতদিন ঝড়-ঝাপটা সামলে টিকে থাকে!' আমার কথা শেষ হল কি হল না, যথারীতি অভিষেক জিভ থেকে উত্তর পেড়ে আনল |
মাঝে-মধ্যে মনে হয়, ও এত কেন জানে! কিন্তু সেই মুহূর্তে আমার সন্দেহ সত্যি হতে চলেছে এমনতর ইঙ্গিতে ওসব না-ভেবে সঙ্গে-সঙ্গে বলি : 'মানে? অরণ্যদেব? চলমান অশরীরী? এই মোরিগাঙে? সত্যি?' |
'মিথ্যে |
আজকাল সিগারেট-মদ ছেড়ে দেখছি তোর মাথাটা পুরো গেছে |
কেউ নেই, কিছু নেই, ফিউজ উড়ে গেছে! মিশা, ছেলেটাকে কী করলি বল তো! বললাম আদল, আর ও মাকড়া অরিজিনাল ভাবছে! শোন, নীলকর সাহেবরা এখানে লোকগুলোকে ছেড়ে দেওয়ার দিনগুলোতে একটা বাড়ি বানিয়েছিল নিজেদের থাকার জন্য |
গাছের ফাঁকে-ফোঁকরে |
ওটার আদলটা অনেকখানি অরণ্যদেবের গাছবাড়ির কাছাকাছিই |
আমি নিজে না-দেখলেও আমার পরিচিত একজনের কাছে ফটোতে দেখেছিলাম |
ভদ্রলোক যখন ফটোটা তুলেছিলেন, তখনও ডিজিটাল ক্যামেরার কনসেপ্টটাই আসেনি |
তাই বললাম, এখনও আছে কিনা জানি না |
' শুরুর দিকের খোঁচা-দেওয়া হালকা চালের কথাগুলো থেকে ফের পাণ্ডিত্যের গাম্ভীর্যে ঢুকতে কোনওই কসরত করতে হয় না অভিষেককে |
জুতোর তলায় শুকনো ঝরাপাতা মাড়িয়ে আমরা আরও-কিছুটা পরে এসে পৌঁছোই আর-এক জঙ্গলে; বটের জঙ্গল |
কোনও-এক অতিদূর অতীতে হয়তো একটিই বটগাছ ছিল এখানে, আজ আর কোনওভাবেই সেই প্রথম আকরটিকে চেনা যায় না আলাদা করে |
দীর্ঘ ঝুরি নেমে গিয়ে মাটি নিয়েছে তার, বহু শাখায় পল্লবিত হয়ে সেই প্রাথমিক ক্রমশ এক থেকে বহু হয়ে উঠেছে |
'বহুত্ববাদী বট' - আমি ব-এর অনুপ্রাস করে বলি আর রবীন্দ্রনাথ আওড়ায় মিশা : 'দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে, যাবে না ফিরে!' যেহেতু এমন কোনও দৃশ্যকল্প আমরা দেখিনি কখনও, অভিজ্ঞতায় না-থাকার কারণে যেহেতু কখনও ভেবে ওঠাও সম্ভব হয়নি, ফলত ওই মুহূর্তে অমন বিস্তৃত বটবীথি দেখে আমরা প্রায় প্রত্যেকেই অবাক বিস্ময়ে ঘুরপাক খাচ্ছিলাম ন... |
প্রশ্নচিহ্নের মতো ঘাড়, সম্পূর্ণ সিধে করে, অনেকটা বিস্ময়চিহ্নের ধাঁচে সোজা রেখে ঘন সবুজ পাতার ফাঁক গলে আকাশের দিকে চেয়ে মিশা তখন নিজের মনে গেয়ে চলেছিল : 'দূরদেশী সেই রাখাল ছেলে...আমার বাটের বটের ছায়ায় সারা বেলা গেল খেলে...গাইল কী গান সেই তা জানে, সুর বাজে তার আমার প্রাণে...' - বুঝতে পারছিলাম, মিশা ধীরে-ধীরে আবারও... |
কিছু না-জেনেই ও আচমকা চিৎকার করে উঠেছিল, যাতে সম্বিৎ ফিরে পায় মিশা; আর আমিও বুঝে যাই আগামীদিনে ওর এই মুড স্যুইং আটকানোর অব্যর্থ দাওয়াই কী হতে চলেছে |
মিশার দিকে গভীর মনোযোগের কারণে অভিষেক চেঁচিয়ে কিছু বলল, এটুকু বুঝলেও ঠিক কী বলল, তা বুঝতে পারিনি |
সিগারেট ধরিয়ে এবার কাছে এল অভিষেক : 'ওই দেখ অরণ্যদেব, তোর গাছবাড়ি! তোমার ডায়না পামার তো তোমার সঙ্গেই আছে! গো অ্যান্ড লেট এনজয়!' কথার শেষটুকু মিশার দিকে তাকিয়ে বলে ও |
মিশার চোখ ঈষৎ লজ্জাভ; খানিক ধাতস্থ হয়ে পালটা খোঁচানোর চেষ্টা করি : 'আর তুই বুঝি সম্রাট জুনকার! সদ্যবিবাহিত - ', আমি উদ্দীপনার দিকে ইশারা করতে যাই আর তখনই আমার মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে 'না ভাই, কিলাউইয়ের সোনালি সমুদ্রতট আর জেড হাউসের বাড়ি দিতে পারব না তোদের হনিমুনে! অত রেস্ত নেই!' বলে অভিষেক ডান হাতের তর্জনী উপরের দ... |
উদ্দীপনা, আমাদের চারজনের মধ্যে বয়সে ছোটো, পিঠে রুকস্যাকের বোঝা নিয়েই উঠতে শুরু করে |
ওর দেখাদেখি আমরাও এসে জুটি ওর সঙ্গে |
প্রায় দেড়শো বছর আগে বানানো হলেও উঠতে খুব-একটা অসুবিধা হয় না আমাদের, শুধু ইতস্তত জমে-থাকা শ্যাওলা দেখে পা ফেলতে হয় |
সেইসব সতর্কতা মাথায় রেখে আমরা ধীরেসুস্থে উঠে আসি গাছবাড়ির বারান্দা জাতীয় কাঠের পাটাতনে |
ভিতরে দুটো ঘর, পিছন দিকটায় সামনের মতোই একটা বারান্দা; দুটো বারান্দাই কাঠ দিয়ে ঘিরে-দেওয়া, শুধু খানিকটা জায়গায় কোনও ঘেরাও নেই; বোঝা যায়, বাড়িটার দু'দিক দিয়েই প্রবেশের বন্দোবস্ত ছিল একসময় |
গাছবাড়ির ভিতর জোলো গন্ধ, স্যাঁতসেঁতে ভাব |
জানলা দরজা বারান্দা - যেদিক দিয়েই তাকানো যাক-না-কেন, সবুজের সন্নিবেশ |
গাছের এত ঘনিষ্ঠ হয়ে রাতে থাকাটা আদৌ ঠিক কিনা জানতে চেয়েছিলাম মিশার কাছে, ও গাছ ভালোবাসে, নিজের বাড়ির ছাদটাকে মনের আনন্দে গাছ দিয়ে সাজিয়েছে, কিন্তু ও কিছু বলার আগেই অভিষেক পালটা ছুঁড়ে দিল বছর চারেক আগে আমার আর ওর, মানে অভিষেকের, চা-বাগানের ভিতর ছোট্ট তাঁবুতে রাত কাটানোর প্রসঙ্গ |
স্বভাবতই ধামাচাপা পড়ে গেল আমার আশঙ্কা এবং অনতিবিলম্বে ঠিক হয়ে গেল : সেই রাতটুকু আমাদের গাছবাড়িতেই কাটবে |
এর কিছুক্ষণ পরে দেখা গেল, উদ্দীপনা পিছনের বারান্দায় বসে পা ঝুলিয়ে দিয়েছে নিচে, যা ছুঁয়ে যাচ্ছে বারান্দার ঠিক নিচের ডালে প্রায়-গোল পাতাগুলো; মিশা ওর পাশে দাঁড়িয়ে উপরের সরু ডাল ধরে নাড়াচ্ছে আর বৃষ্টিপাতের ফলে গাছের পাতার ধরে-রাখা জলের ফোঁটায় ভিজিয়ে নিচ্ছে মুখ; ন্যাপস্যাক থেকে তিনশো পঁচাত্তর মিলিলিটারের একটা ব্ল... |
এরও কিছু পরে অভিষেক যখন প্রথম পেগটি শেষ করে সবে দ্বিতীয় পেগটি সাজিয়ে বসেছে, উদ্দীপনা আর মিশা ঘরে ঢোকে এবং অভিষেককে ওই অবস্থায় দেখে দু'জনেরই চিল-চিৎকার |
উদ্দীপনা একা থাকলে হয়তো অভিষেক অতটা পাত্তা দিত না, কিংবা চুপচাপ একতরফা শুনে নিত না সবটা, কিন্তু ওর সঙ্গে মিশাকে দেখে আর রা কাড়ে না, বরং বিনীতের মতো জানায় যে, ওই দ্বিতীয় পেগটিই আপাতত তার শেষ পেগ এবং সে কোনওভাবেই এখানে শুধু মদ্যপান করতে আসেনি, অন্যদের মতো তারও প্রবল আগ্রহ এই মোরিগাঙকে নিয়ে, এমন-কি, এই পাত্রটি খতম ক... |
কথামতো অভিষেক গ্লাসের মদটুকু গলায় চালান করে দিয়ে আমাদের সঙ্গেই নেমে আসে গাছবাড়ি থেকে |
সবার শেষে যেহেতু আমি নেমেছিলাম, দেখেছিলাম, অভিষেক কিন্তু স্টেডি - পায়ে না-ছিল ন্যূনতম টলোমলো ভাব, না-ছিল কণ্ঠস্বরে সামান্য শৈথিল্য |
নিচে নেমে আমরা ঠিক করে নিয়েছিলাম যে, এবার গাছবাড়ির পিছন দিকটা দিয়ে হাঁটব কিছুটা; কারণ যেহেতু অন্যদিকের এবড়োখেবড়ো পথরেখা ধরে হেঁটেই এখানে এসে পৌঁছেছিলাম আমরা |
গাছবাড়ির পিছনে সর্পিল একটি সরু পথ, আলের মতো অনেকটা, ধরে খানিক এগোতেই এতক্ষণের গভীর জঙ্গল ফিকে হতে শুরু করে; যদিও তাতে সবুজের কোনও কমতি নেই |
বটের জঙ্গল শেষ হলে পর, তুলনায় কম ঘন গাছগাছালির মধ্যে আমাদের নজরে পড়ে বাঁশ আর তালগাছের ঝালর পাতা দিয়ে তৈরি গুটিকয় জীর্ণ ঘর |
ততোধিক মলিন কয়েকটা বাচ্চা ছেলে-মেয়ে, উদোম গা, নিজেদের মধ্যে কোনও-একটা খেলায় মত্ত; যে-খেলা হামাগুড়ি দিয়ে খেলতে হয়, হয়তো, যা আমাদের কাছে অজানা |
মিশা আর উদ্দীপনা এগিয়ে যায় ওদের দিকে |
জিন্সের পকেট থেকে বের করে দেয় ট্রেনে-কেনা জেলি-লজেন্স |
চেষ্টা করে ভাব জমানোর |
কিন্তু সম্পূর্ণ অপরিচিত ভাষা দু' তরফেই, ফলে কোনও সংযোগ গড়ে ওঠে না সেভাবে |
আমাদের মধ্যে একমাত্র অভিষেক, এনজিওদের সঙ্গে ল্যাঙ্গুয়েজ মিশনে কাজ করার ফলে কিছু-কিছু আদিবাসী ভাষা বোঝে ও বোঝাতে সক্ষম, বাচ্চাদের দেখে একেবারেই উৎসাহ দেখায় না |
তখনই একটা ঘরের একদিকের ঝালর পাতা সরিয়ে বেরিয়ে আসে কালো-কুঁদো একটি নারী, হাত দুটো সামনের দিকে ঝুলে প্রায় হাঁটু ছুঁয়েছে, পিঠ আর কোমরের সন্ধিস্থল উটের কুঁজের মতো উঁচু, ঊর্ধ্বাঙ্গ অনাবৃত, তুলনায় ছোটো ওই ঝালর পাতা দিয়ে নিম্নাঙ্গ ঢাকা |
ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরি যেন জেগে ওঠে; সবে দু' টান দিয়েছে-কি-দেয়নি, সিগারেটটা ফেলে পা দিয়ে নিভিয়ে অভিষেক চলে আসে আদিম সেই প্রত্নপ্রতিমার সামনে |
দূর থেকে দেখছি, ঘন-ঘন ঘাড় নড়ছে অভিষেকের, সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হাত দুটোও, একবার ঝুঁকেও পড়ল আদিবাসী ওই মহিলাটির মতো; সেই মুহূর্তে আমার মনে হচ্ছিল ব্লেন্ডার্স প্রাইড তাদের নতুন বোতলগুলোকে অমন হেলানো করে দিলে দেখতেও ভালো লাগে, আবার বয়ে নেওয়ারও সুবিধা হয়; আসলে আমার মনে একটা আশঙ্কার জন্ম হচ্ছিল : দু' পেগে মাতাল হওয়ার ব... |
আজ তেমন অল্পেই চাগাড় দিল কিনা, ভেবে একটু ঘাবড়েই গেছিলাম আর তখনই অভিষেক আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে গিয়ে তাকিয়ে ছিল আমাদের দিকে, কাছে ডেকে নিয়েছিল হাতের ইশারায় |
মহিলাটি ওইভাবে ঝুঁকে হাঁটছিল আমাদের সামনে, পিছনে আমরা তিনজন বারবার আকারে-ইঙ্গিতে অভিষেকের কাছে জানতে চাইছিলাম কী কথা হল, আমরা কোথায় চলেছি, ওই মহিলা ওইভাবে হাঁটছেন কেন - ইত্যাদি |
আমি আলগা করে এও জানতে চেয়েছিলাম যে, আদৌ অভিষেকের নেশা হয়েছে কিনা |
আদিবাসী রমণীটির পিছু-পিছু হাঁটতে-হাঁটতে অভিষেক বলেছিল : 'আমাদের ভাষা ওরা বোঝে না, ওদের ভাষাও আমি বুঝতে পারছি না |
কিছু আদিবাসী টিউন আমার জানা, কিন্তু ওতেও কমিউনিকেট করা গেল না, তাই সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ দিয়েই কাজ চালাচ্ছিলাম |
আর মেয়েটা বিশ্বাস করে, ও আদৌ কুঁজো হয়ে নেই, ট্রাইবাল স্পেশালিস্টরা কী বলবে জানি না, আমার তো পাতি মাথার গোলমাল মনে হল |
ওদের আরও লোকজনের কাছে নিয়ে যাচ্ছে আপাতত |
খাবারদাবার পাওয়া গেলেও যেতে পারে |
চল, চল |
গিয়েই দেখা যাক |
' |
বেশি হাঁটতে হল না, কিছুটা এগোতেই চোখে পড়ল একটি নদী, অভিষেকের ঠোঁট নাড়ার ভঙ্গিমায় আমরা বুঝলাম, এই খরস্রোতাই ময়ূরী কিংবা মৌরি নদী; নদীর ধারে ছোট্ট একচালা একটি ঘর দেখে ওই মুহূর্তে যদিও কিলাউইয়ের সমুদ্রতটের জেড পাথরের বাড়ির কথা মনে পড়েছিল আমার; কিন্তু সেই জীর্ণ কুঁড়ের সামনে বসে-থাকা লাঠি-হাতে বৃদ্ধটিকে যেই-না মজ বু... |
সেই কুঁজো মহিলাকে অনুসরণ করে অতঃপর আমরা এসে দাঁড়াই ওই প্রাচীন পুরুষের সামনে; প্রাচীন বটবৃক্ষ যেন - বয়সের ভারে বুঝি-বা ঈষৎ ন্যুব্জ |
সেই প্রৌঢ় ফোকলা মুখে হাসি এনে অভিবাদনের ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়াতেই আমাদের অবাক হওয়ার পালা : এই মানুষটিরও পিঠ আর কোমরের মধ্যবর্তী মাংসপিণ্ড, শিরদাঁড়া ঠেলে উঠেছে মাধ্যাকর্ষণের বিরুদ্ধে |
নয়ন বিস্ফারে আমি ইঙ্গিত করি পাথরটার দিকে, যাতে এতক্ষণ বসে ছিলেন প্রৌঢ়, সেখানে কাতারে আঁচড়ে-তোলা বাংলা বিরামচিহ্নের পূর্ণচ্ছেদ |
প্রত্যাভিবাদন জানিয়ে অভিষেক ওঁর কাছে ইঙ্গিতে বিষয়টি জানতে চাইলে - ভাঙা বাংলা, কিছুটা পূর্ব বাংলার উপভাষা-ঘেঁষা, কিছুটা আদিবাসীদের নিজস্ব - জগাখিচুড়ি এক ভাষায়, যার সব শব্দের অর্থ না-বুঝলেও বক্তব্যবিষয় বুঝতে খুব-একটা অসুবিধা হয় না আমাদের, জানান যে, ওই প্রতিটি আঁচড় আসলে ওঁর জন্মের পর থেকে এখনও পর্যন্ত প্রতি পূর্ণ ... |
শুরুর দিকের দাগগুলো যা তুলনায় আবছা হয়ে এসেছে, উনি জানান, সেগুলো ওঁর বাবা কিংবা মা, কেউ-একজন করেছিলেন |
উদ্দীপনা পাথরটার সামনে বসে পড়েছে, একমনে গুনে চলেছে জন্মদাগ |
অভিষেক বহুবিধ উপায়ে প্রৌঢ়ের সঙ্গে কথা চালিয়ে যাচ্ছে |
খানিক পরে ভয়ার্ত মুখে এসে অভিষেকের শার্টের খুঁট ধরে টানে উদ্দীপনা; নিচু গলায় যখন কথা বলছিল ওরা, আমি আর মিশা কোনওরকমে হাসি-হাসি মুখে চেয়ে ছিলাম প্রৌঢ়ের দিকে; ওঁর চোখ দুটোর অতলান্ত গভীরতায় না-জানি কত-কত গল্প ঠাসা আছে, চোখে চোখ রাখতেই মনে হয়েছিল আমার |
অভিষেক ততক্ষণে মোবাইলের ক্যালকুলেটরে কী-সব হিসেবনিকেশ সেরে এসে দাঁড়িয়েছিল আমাদের সামনে : 'এই বুড়ো মালটার কথা যদি সত্যি হয়, তবে তো নীলবিদ্রোহ এর নিজের চোখে দেখা!' 'মানে?' - চমকে উঠে প্রৌঢ়ের উপস্থিতিকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে আমি বলি |
'উডি যা ক্যালকুলেশন করেছে, তাতে করে মালটার বয়স, কিছু না-হলেও, আড়াইশোর কাছেপিঠে তো হবেই!' 'সে তো হতেই পারে!' - হাসিতে এমনই একটা বিনয়ী ভাব ধরা ছিল আমার মজ বুড়োর; আমিও ভাবি, মজ বুড়ো মানে তো এমনটা হওয়া আশ্চর্যের নয়, বরং এমনটাই তো হওয়ার ছিল : জনপদ আর জঙ্গলের নিয়ম এক নয়; পাহাড় সমুদ্র জঙ্গলের গুহা-কন্দরে কত রহস্যই... |
মিশা আর উদ্দীপনার চোখে তখনও বিস্ময় আর অবিশ্বাস একাকার, অভিষেক হয়তো আমার মনের ভাব বুঝতে পেরেছে, প্রৌঢ় ততক্ষণে কুঁজো শরীরটাকে আবার এনে পাথরের উপর রেখেছে, ব্যস্তসমস্ত হয়ে ও গিয়ে বসে পড়ল সামনের ঘাসজমিতে, বুড়োর পায়ের কাছে; ওর দেখাদেখি ধীরে-ধীরে আমরাও অতএব |
মজ বুড়ো এবার গল্প শোনাবে : কিট-হেলোয়েজ-রেক্স গল্প শুনবে একমনে; মজ দাদু ডাইনে-বাঁয়ে মাথা দোলাতে-দোলাতে গল্প বলে চলে : |
আমরা এখানকার লোক নই, এখানে থাকব ভাবিনি কখনও |
Subsets and Splits
No community queries yet
The top public SQL queries from the community will appear here once available.